মরা হাতি এবং উত্তমকুমারের হাসির মধ্যে মিল কোথায়? দু’টোরই দাম লাখ টাকা৷ ওই হাসিতে ভর করেই দীর্ঘ দিন বাংলা ছবির প্রেক্ষাগৃহে রাতকে দিন করে জ্বলে উঠত হাজার টাকার ঝাড়বাতি৷ নির্বাক দৃশ্যে শুধু হেসেই যে অযুত সংলাপ বলা যায়, সেই উদাহরণ ভুরি ভুরি ছড়িয়ে আছে এই উত্তমপুরুষের ছবিতে৷
রীনা ব্রাউনের জন্য জাক্তারির উজ্জ্বল ছাত্র কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রেমিকের হাসিই শুধু নয়৷ উত্তমকুমারের ম্যানারিজমে সওয়ার হয়ে বাংলা ছবিতে এসেছে নায়ক অরিন্দমের সিগারেটচুম্বিত হাসি থেকে শুরু করে চিকিৎসক অগ্নীশ্বরের দাপুটে বেপরোয়া হাসি৷ আবার ‘বাঘবন্দি খেলা’-র ভবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রূর আনন্দ কী অনায়াসে রোম্যান্টিক মেদুরতার রূপ নেয় ‘শঙ্খবেলা’-র নৌকোবিহারে কে প্রথম কাছে এসেছি, সেই হিসেবনিকেশের ঘনিষ্ঠতার আলিঙ্গনে৷ ‘সন্ন্যাসী রাজা’-র স্মিত হাসি কখন যেন কাহারবা থেকে দাদরার তালে পাল্টে যায় দুই গাড়িচালক গৌরহরি এবং হৃদয়হরণের গোবেচারা মুখভঙ্গিতে৷
শেষ হাসি কে হাসবে, এই ভেবে যখন চিত্রনাট্য লেখা হত না, তখন হাসির রকমফেরে তৈরি হত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য৷ এক এক অভিনেতা এই অভিব্যক্তিকে নিয়ে গিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতায়৷ তাই ‘ঝিন্দের বন্দী’-তে শঙ্কর সিংয়ের মনলোভা হাসির থেকে তুরুপের তাস উড়ে গিয়ে বসে পড়ে খল ময়ূরবাহনের ছলের উপরেই৷ চরিত্রের রংবদলের সঙ্গে মানানসই করে তার হাসিকেও পাল্টে নেওয়ার জন্য পরিচালক ও অভিনেতার মুনসিয়ানা প্রয়োজন৷ ‘অপুর সংসার’ উপহার দিয়েছে বিষণ্ণ হাসির শতেক রূপ৷ অপর্ণার জ্বেলে দেওয়া দেশলাইয়ের আলো, পড়ে থাকা তাঁর মাথার কাঁটা বা সিগারেটের রাংতায় ‘খাবার পরে একটা করে-কথা দিয়েছ’-প্রত্যেক অনুষঙ্গেই জড়িয়ে আছে মলিন বিষণ্ণতা৷ কিন্তু শেষ দৃশ্যে কাঁধে কাজলকে বসিয়ে অপুর মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ৷ একই ছবিতে প্রতি দৃশ্যান্তরে হাসির এই রূপান্তর সম্ভব সেরা পরিচালক এবং অভিনেতার যুগলবন্দিতেই৷
তবে সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটির অন্যতম সেরা উপহারের মধ্যে থাকবে সোনার কেল্লার সন্ধানে ঊষর মরুপথে ফেলুদার অনাবিল হাসি-‘‘আছে, আছে আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে! আমরা ঠিক রাস্তায় এসেছি, তাই আমাদের যাত্রা পণ্ড করবার জন্য এই ব্যবস্থা’’ সংলাপের সঙ্গে৷ রসবোধ প্রখর হলেও প্রদোষচন্দ্র মিত্রের ভক্তরা গল্পের বইয়ের পাতায় তার ঠোঁটে বরাবর একপেশে হাসিতেই অভ্যস্ত৷ এহেন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের প্রাণখোলা হাসি দেখে পাশে দাঁড়ানো জটায়ুর মতোই চমকে যান পর্দায় চোখ রাখা পাঠকও৷
পাঠকরা অবশ্য জানেন নায়কের তুলনায় খলনায়কের হাসি অনেক বেশি জটিল৷ সে হাসি বসত করে শুধুই ঠোঁটে৷ চোখে নয়৷ তাই সেই হাসি হেসেই হালুয়ামোহনবাবুকে নিয়ে নির্লজ্জ রসিকতা করা যায়৷ পেশাদার ন্যুব্জ কুব্জ বাজিকর অর্জুনকে তাতিয়ে দেওয়া যায় তাঁর তনখা বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাসে৷ মগনলাল মেঘরাজের নিষ্ঠুর হাসিতে স্বআরোপিত নির্বুদ্ধিতা মিশে যাওয়ার পর সেটা যেন আবার ফিরে আসে হীরকরাজের চেহারাতেও৷ মগনলাল, হীরকরাজের সজ্জা ছেড়ে উৎপল দত্ত যখন ‘আগন্তুক’-এর মনমোহন মিত্র, তখন তাঁর হাসিতে কূপমূণ্ডকতা ভুলে সারা পৃথিবীকেই নিজের পরমাত্মীয় বানিয়ে নেওয়ার প্রসারিত আনন্দ৷
নায়ক, খলনায়ক তো তাও হাসতে পারেন৷ কিন্তু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়? ক্ষয়িষ্ণু জমিদারিই বরং তাঁর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের নির্মম হাসি ফিরিয়ে দেয়৷ ‘জলসাঘর’-এ সম্মানরক্ষার যুদ্ধে পরাজিত বিশ্বম্ভর রায়ই আবার তাঁর অপার অপত্যস্নেহ উজাড় করে ধরা দেন ‘কাবুলিওয়ালা’-য়৷ খেয়ালী খোঁকির কথামতো তার নিজের ‘হাথি’ উচ্চারণকে শুধরে ‘হাতি’ করার জন্য রহমতের জানকবুল৷ তাঁর উদাত্ত হাসির উচ্ছ্বাস পিতৃস্নেহ হয়ে ঢুকে পড়ে ছোট্ট মিনির মুঠোবন্দি ঠোঙার পেস্তা, বাদাম, আখরোটে৷ ছোট ছোট হাত ঘুরিয়ে ‘খর বায়ু বয় বেগে’ গানের সঙ্গে মিনির নাচ দেখে রহমতের সতৃপ্ত হাসি আজও ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেক বাবার মুখে৷
নির্বান্ধব পরবাস কলকাতায় রহমতের জন্য মিনি ছিল৷ আর, নিজের শহর কলকাতায় নিঃসন্তান পরেশচন্দ্র দত্তের অপত্যসঙ্গী ছিল পল্টু৷ ‘পরশপাথর’ পরেশচন্দ্রের জীবনে স্বর্ণসুখের হাসি আনলেও হারিয়ে গিয়েছিল পল্টুর সারল্যমাখা সঙ্গ৷ সেই সরলতা আবার আসনপিঁড়ি হয়ে বসে ছিল মেসবাড়ির মালিক রজনীবাবুর দাম্পত্যে৷ কলকাতা থেকে দেশের বাড়িতে ফিরে লণ্ঠন তুলে তিনি যখন স্ত্রীর পমেটমমাখা মুখটি দেখেন, সেই মুহূর্তে সব আলো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর নায়ক নায়িকার উপর থেকে সরে গিয়ে পড়ে মাঝবয়সি ওই দম্পতির উপরই৷ অনবদ্য অভিনয়ক্ষমতায় দর্শককে নির্মল হাস্যরস উপহার দিয়ে গিয়েছেন তুলসী চক্রবর্তী৷ অনটনে ফুটিফাটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন লুকিয়ে রেখে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সাজিয়ে গিয়েছেন চুয়াচন্দনে৷ নিজে না হেসে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর দুরূহ কাজ যাঁরা করে এসেছেন, তাঁরা যে নিছক কৌতুকাভিনেতা নন, বরং চরিত্রাভিনেতা-সে কথাই বার বার তুলে ধরেছেন সন্তোষ দত্ত, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনুপকুমারের মতো কুশীলবরা৷
মোনালিসার মুখে না থাকলেও হাসির মান অভিমান হয়৷ অভিনয়রসের সংজ্ঞার বাইরে হাসি নিজেও আপাদমস্তক একটা চরিত্র৷ সে কথা বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে বার বার প্রমাণ করেছেন তারকারা৷ আকাশের তারাদের ঝিকমিক হাসি চোখে পড়ে সহজেই৷ কিন্তু তারা যদি মেঘে ঢাকা হয়? তখন তাঁর হাসি কোমলগান্ধারের সুরে ঝরে পড়ে ঘাসে ঘাসে, আকাশভরা সূর্যতারার নীচে৷ অথবা সে হাসি প্রলাপ হয়ে ঘুরপাক খায় পাগলাগারদের চার দেওয়ালের মাঝে, মিস্টার থেকে সিস্টারের মাঝে মনের মতো বন্ধু খুঁজে নেওয়ার আনন্দে৷ কখনও বা ‘মহানগর’-এর সুব্রত মজুমদারের মধ্যবিত্তজীবনের সঙ্কোচে মুখ লুকিয়ে ফেলে হাসি৷ তাই তো অনিল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে নির্জন সৈকতের বালুকাবেলায় অথবা বনের পথে ঘাসে ঘাসে পা ফেলে জানার মাঝে অজানার সন্ধান করে চলে দর্শক৷ সেলুলয়েডের বাইরে বাস্তবজীবনেও হাসি হল সেই ছদ্মবেশ যা দুঃখকে ভুলে বার বার বিস্ময়ে জেগে উঠতে সাহায্য করে৷
(ছবি অর্ন্তজাল থেকে)
Liked our work ?